
স্টাফ রিপোর্টার: রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থপনা পরিচালক মো. টিপু সুলতান। আওয়ামী লীগের ঘরের লোক হওয়ার সুবাদে বিপিসির জ্যেষ্ঠতার তালিকায় থাকা ১০ জনকে ডিঙিয়ে ১১ নম্বরে থাকা এমপিএলর মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ) টিপু সুলতানকে প্রতিষ্ঠানটির এমডি করা হয় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং ভোক্তাদের নিম্নমানের জ্বালানি সরবরাহসহ মেঘনা পেট্রোলিয়ামে এমডি টিপু সুলতান খুলে বসেছে ঘুষের দোকান। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ঘাটে ঘাটে তিনি দুর্নীতির জাল বিছিয়ে রেখেছেন। আগামী ২৭ জুলাই শেষ হচ্ছে তার চাকরির মেয়াদ। কিন্তু স্বপদে টিকে থাকতে চাকরির মেয়াদ বাড়াতে তিনি করে যাচ্ছেন নানা দৌড়ঝাঁপ।এমপিএল বোর্ড চেয়ারম্যান ফারহানা মমতাজের সহায়তায় বহাল থাকতে তিনি নানান তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কর্মকর্তাদের অনিয়ম- দুর্নীতির কারণে ডুবতে বসেছে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। খোদ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থপনা পরিচালক মো. টিপু সুলতান তেল চুরির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিপত্তিতে পড়েছেন নিরাপত্তাকর্মীসহ অনেকেই। প্রতি মাসে তেল চুরির ১০ কোটি টাকা যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে। এমডি পাচ্ছেন আয়ের অর্ধেক।
অভিযোগ সূত্র বলছে, সারা দেশের ২১টি ডিপোতে তেল সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি লরিতে (তেলবাহী গাড়ি) ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন মিলে গড়ে ৯ হাজার লিটার জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। এসব লরির ধারণক্ষমতা ১০ হাজার লিটার। দুর্ঘটনা এড়াতে এক হাজার লিটারের জায়গা সাধারণত ফাঁকা রাখা হয় প্রতিটি লরিতে। কেউ চাইলে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ হাজার লিটার পর্যন্ত তেল পরিবহন করতে পারে। মূলত যে স্থানটি ফাঁকা থাকে সেখানেই ২০০ থেকে ৫০০ লিটার পর্যন্ত অতিরিক্ত তেল পরিবহন করে চক্রটি। এই তেলের জন্য কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয় না। তেলবাহী লরি বাইরে বের হওয়ার পর সুবিধাজনক স্থানে ওই তেল নামিয়ে তা বিক্রি করে দেয় তারা। প্রায় প্রতিদিনই এভাবে তেল চুরি হয়। পরে চুরি যাওয়া এই তেল সিস্টেম লস, ট্রান্সপোর্ট লস হিসেবে সমন্বয় মেঘনা কর্তৃপক্ষ সমন্বয় করে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি এমআই, ফতুল্লা, বাগাবাড়ি, পতেঙ্গা গুপ্তখাল এলাকায় মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ডিপো থেকে তেলবাহী গাড়ি বের হওয়ার সময় দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা তা পরীক্ষা করতে গেলে তারা বাধার মুখে পড়েন। এ সময় তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। কিন্তু পরে এই ঘটনা জানাজানি হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো নিরাপত্তা কর্মীদের চাকরি হারানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা জোনের ডিজিএম মো.লুৎফর রহমান এমডির ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন। ডিপো থেকে প্রতি মাসে টাকা কালেকশন করেন তিনি। এর পরে সিন্ডিকেটের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
সম্প্রতি মেঘনা পেট্রোলিয়ামের প্রধান স্থাপনা থেকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মেসার্স আবদুর রউফ অ্যান্ড সন্সের নামে একটি গাড়িতে তেল ভর্তি করা হয়। গাড়িটি ‘সিকিউরিটি পয়েন্টে’ পৌঁছানোর পর সন্দেহ হলে অতিরিক্ত একটি ড্রাম পাওয়া যায়, যেখানে প্রায় ২০০ লিটার ডিজেল ছিল। একই ভাবে গত সপ্তাহে ফতুল্লা ডিপোতে গিয়ে দেখা গেছে দুটি গাড়িতে তেল ভর্তি করে বের হচ্ছেন। এই সময় গাড়িতে অতিরিক্ত একটি ড্রাম দেখা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, সরাসরি তেল চুরির সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই শ্রমিক। এদের পরোক্ষ সহায়তা করছেন কোম্পানির ব্যবস্থপনা পরিচালক মো. টিপু সুলতান। কেউ এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়। বিশেষ করে নিরাপত্তাকর্মীরা নানা রকম ভয়ভীতির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চাকরি জীবনের শুরু থেকেই টিপু সুলতান বেপরোয়া। কখনোই চাকরি বিধিমালার তোয়াক্কা করেননি। তার বিরুদ্ধে রয়েছে বদলী বাণিজ্য ও পদোন্নতি বাণিজ্য করে লক্ষ লক্ষ টাকা কামানোর অভিযোগ। তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই নানান অনিয়মে জড়িয়েছেন।
তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে অফিসে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শত শত কোটি কা হাতিয়ে নিয়ে গড়ে তুলেছেন টাকার পাহাড় । তিনি মূলত আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এর মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকার তেল চুরি করে গড়ে তুলছেন তার এই সম্পদের রাজ্য। তার টাকার ভাগ স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ থেকে শুরু করে কোম্পানির সিবিএ নেতাদেরকেও পৌঁছে দেয়া হতো। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর সাগরপাড়ায় রয়েছে বিলাসবহুল ১০ তলা ফ্ল্যাট বাড়ি, শত শত বিঘার উপরে মাছের পুকুর। এই পুকুরের মাছ বিক্রি করে প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করেন। এছাড়া ধানমন্ডির ঝিগাতলায় ফ্ল্যাট সহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি রয়েছে টিপু সুলতানের মালিকানাধীন।
তার চাঁদাবাজির বিষয়ে বিভিন্ন ডিপো ইনচার্জদের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তারা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন তিনি আওয়ামী লীগের লোক কিন্তু এখন সে রং পাল্টিয়ে চাঁদাবাজি করছে। এসব নানা অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তিনি ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীর আত্নীয় পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে তা বন্ধ করে দেন।
টিপু সুলতানের দুর্নীতির ব্যাপারে দুদকের এক উপ-পরিচালকের দৃষ্টি আর্কষন করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে বা পত্র-পত্রিকায় এ সংক্রান্ত কোন প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে আইনানুনাগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে জানান তিনি।
এবিষয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. টিপু সুলতানের সাথে বক্তব্যের জন্য মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।

